মদীনার ফযীলতThis is a featured page

মদীনার ফযীলত এবং সেখানে বসবাস
ও যিয়ারতের আদবসমূহ
মূলঃ
শাইখ আব্দুল মুহসিন ইবনে হামাদ আল আব্বাদ আল বাদর
শিক্ষক মসজিদে নববী,
ভূতপূর্ব প্রো-ভিসি, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় মদীনা
মুনাওয়ারা, সাউদী আরব।
ভাষান্তরঃ
ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া
এমএম (ঢাকা), লিসান্স, এমএ, এম-ফিল, পিএইচ ডি (মদীনা)
প্রভাষক, আল-ফিকহ বিভাগ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়,
কুষ্টিয়া বাংলাদেশ

অনুবাদকের কথা
আল্লাহর জন্যই যাবতীয় প্রশংসা আদায় করছি, যিনি আমাকে হিদায়াত দিয়েছেন, আর তাঁর রাসূলের পবিত্র মদীনা নগরীতে জীবনের এক বিরাট অংশ পড়ালেখা ও বসবাসে কাটাবার সুযোগ দিয়েছেন। পবিত্র মদীনায় অবস্থানকালে আমার দেশীয় বাংলাভাষাভাষীগণ আমাকে ও আমার কিছু বন্ধু বান্ধব ছাত্র ভাইদেরকে প্রায়ই মদীনা শরীফ সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্ন করতো। তখন থেকেই এমন একটি গ্রন্থের সন্ধান করছিলাম যা কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর ভিত্তিতে ‘মদীনা’ সংক্রান্ত সকল গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জওয়াব হতে পারে। ইতিমধ্যেই পেয়ে গেলাম আমারই উস্তাদ শাইখ আব্দুল মুহ্সিন আল্ বাদ্র এর অধিকাংশ জিজ্ঞাসার জবাব সমৃদ্ধ এমন একখানা গ্রন্থ। তাই বিভিন্ন ব্যস্ততার মধ্যেও বইটি অনুবাদ করতে দেরী করা সমীচিন মনে করিনি। শাইখ আব্দুল মুহসিন আল আব্বাদ “আল্লাহ তাকে তাঁর দ্বীনের খেদমতের জন্য দীর্ঘজীবি করুন” তিনি বর্তমান যমানার মুহাদ্দিসদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর নিকট আমি আক্বীদা বিষয়ের সবক গ্রহণ করি আমার অনার্স পর্বে । তার পর মাঝে মধ্যে মাসজিদুন নববীতে তার দারসে বসার সুযোগ পাই, যেখানে তিনি পর্যায়ক্রমে হাদীসের ছয়টি কিতাবের দারস দিয়ে যাচ্ছেন। যার দারসের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো হাদীসের সনদ ও মতন দু’ অংশের সঠিক জ্ঞান দান, যার তুলনা বিরল। তার ছাত্র হতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করি। আশা করছি এ ছোট বইটি মদীনা বসবাস ও যিয়ারতের পক্ষে যথেষ্ট সহায়ক হবে। আল্লাহ আমার এ প্রচেষ্টা কবুল করুন। আমীন। আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া পবিত্র মদীনা নগরী। ১৯/০২/১৪২৪ হিঃ বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম আল্লাহর জন্যই সমস্ত প্রশংসা, আমরা তাঁর প্রশংসা করছি, তার কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করছি, তার কাছেই ক্ষমা চাচ্ছি, আমাদের আত্মার সমূহ অনিষ্ট ও কর্মকান্ডের খারাপি হতে আল্লাহর কাছেই আশ্রয় নিচ্ছি, যাকে আল্লাহ হিদায়াত করেন তাকে পথভ্রষ্ট করার কেউ নেই, আর যাকে পথভ্রষ্ট করেন তাকে হিদায়াত দেয়ার কেউ নেই। আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, একমাত্র আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন মা‘বুদ নেই, তাঁর কোন শরীক নেই, আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা, রাসূল, অন্তরঙ্গ বন্ধু ও তাঁর সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে উত্তম ব্যক্তি। তাকে আল্লাহ কিয়ামতের আগে সুসংবাদদান কারী ও ভয়প্রদর্শনকারী রূপে, আল্লাহর দিকে তাঁর নির্দেশে আহ্বানকারী হিসাবে এবং প্রজ্জলিত আলোকবর্তিকা রূপে প্রেরণ করেছেন। তিনি উম্মতকে যাবতীয় কল্যাণের পথনির্দেশ করেছেন, আর যাবতীয় অকল্যাণকর বস্তু থেকে সাবধান করেছেন। হে আল্লাহ, আপনি তার উপর সালাত, সালাম ও বরকত দিন, অনুরূপভাবে তার বংশধর ও সাহাবী গণ সহ যারা কিয়ামত পর্যন্ত তার পথে চলবে, তার আদর্শের অনুসরণ করবে তাদের উপর। তার পরঃ মদীনা নগরী; রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মদীনা, যার অপর নাম ত্বাইবাতুত্বাইবা তথা পবিত্র পূণ্যভূমি, ওহী নাযিল হওয়ার স্থান, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে জিব্রীল আল-আমীনের অবতরণ স্থান, ঈমানের আশ্রয়স্থল, মুহাজির ও আনসারদের মিলনকেন্দ্র, যারা ঈমান এনেছিল ও বসতি স্থাপন করেছিল তাদের জন্মভূমি, মুসলমানদের প্রথম রাজধানী, এখান থেকেই আল্লাহর পথে জিহাদের জন্য পতাকাসমূহ উত্তোলিত হয়েছিল, সত্যের পতাকাবাহী সেনানীগণ মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে আসার জন্য বের হয়ে পড়েছিল। আর এখান থেকেই আলোর বিচ্ছুরণ ঘটেছিল, ফলে হিদায়াতের আলোয় আলোকিত হয়েছিল জমীন। মুহাম্মাদ মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরতের স্থান, এদিকেই তিনি হিজরত করেছিলেন, এখানেই তিনি জীবনের শেষ দিনগুলো কাটিয়েছিলেন, এখানেই তার মৃত্যু হয়েছে, এখানেই তাকে কবর দেয়া হয়েছে, আবার এখান থেকেই (তাঁকে হাশরের জন্য) পূনরুত্থিত করা হবে। আর তার কবরই প্রথম কবর যা তার বাসিন্দাকে (হাশরের জন্য) প্রথম বের করবে। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কবর ব্যতীত অন্য কোন নবীর কবর কোথায় আছে সে সম্পর্কে অকাট্য কোন প্রমাণ নেই। এ বরকতময় মদীনা নগরীকে আল্লাহ তা‘আলা সম্মানিত করেছেন এবং শ্রেষ্টত্ব প্রদান করেছেন, আর একে করেছেন মক্কা নগরীর পরে সবচেয়ে উত্তম স্থান। মক্কা নগরী মদীনা নগরী থেকে শ্রেষ্ঠ এ কথার প্রমাণ রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী- যখন তাকে কাফেরগণ মক্কা থেকে বের করে দিচ্ছিল আর তিনি মদীনার দিকে হিজরতের উদ্দেশ্যে বের হয়ে পড়লেন তখন তিনি মক্কা নগরীকে উদ্দেশ্য করে বললেনঃ
"وَاللهِ إنّكِ لَخَيْرُ أرْضِ اللهِ، وَأَحَبُّ أَرْضُ اللهِ إلى اللهِ، ولو لا أنِّي أُخْرِجْتُ منكِ مَا خَرَجْتُ"
“আল্লাহর শপথ নিশ্চয়ই তুমি আল্লাহর জমিনের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম জায়গা, আর আল্লাহর নিকট আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় ভূমি, যদি আমাকে তোমার থেকে বের করে না দেয়া হতো আমি বের হতাম না”। এটা একটি সহীহ হাদীস যা ইমাম তিরমিযি এবং ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেছেন। অপরপক্ষে যে হাদীসটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দিকে সম্পর্কিত করা হয়ে থাকে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দো‘আ করেছেন এবং বলেছেনঃ
"اللهُمَّ إِنَّكَ أَخْرَجْتَنِيْ مِنْ أَحَبِّ الْبِلاَدِ إليّ ـ يعني مكةَ ـ فَأَسْكِنِّيْ فِيْ أَحَبِّ البِلادِ إلَيْكَ ـ يعني المدينةَ ـ"
“হে আল্লাহ! আপনি আমাকে আমার সবচেয়ে প্রিয় দেশ থেকে বের করেছেন অর্থাৎ, মক্কা নগরী- সুতরাং আপনি আমাকে আপনার নিকট সবচেয়ে প্রিয় দেশের অধিবাসী করুন অর্থাৎ, মদীনা নগরী-” এ হাদীসটি বানোয়াট। অর্থের দিক থেকেও তা সঠিক নয়; কেননা তাতে এ কথা বুঝা যায় যে, আল্লাহর কাছে যা সর্বাধিক প্রিয় রাসূলের কাছে তা সর্বাধিক প্রিয় নয়, আর রাসূলের কাছে যা প্রিয় তা আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় নয়। অথচ জানা কথা যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভালোবাসা মহান আল্লাহর ভালোবাসার অনুগত। আল্লাহর কাছে যা সবচেয়ে বেশী প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছেও তা সবচেয়ে বেশী প্রিয়। এ বরকতময় মদীনা নগরীর ফযীলত, বসবাসের আদব কায়দা এবং যিয়ারত সম্পর্কে আলোচ্য বইটি লিখতে ইচ্ছা করছি, এতে এর কিছু ফযীলত , বসবাস ও যিয়ারতের কিছু আদব বা নিয়মনীতির উল্লেখ করব।

বরকমতময় মদীনা নগরীর কিছু ফযীলত $ আল্লাহ তা‘আলা মক্কা নগরীকে যে ভাবে হারাম তথা সম্মানিত ও নিরাপদ করেছেন এ মদীনা নগরীকেও তেমনিভাবে হারাম ও নিরাপদ করেছেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এসেছে তিনি বলেছেনঃ "إِنَّ إِبْرَاهِيْمَ حَرَّم مَكَّةَ، وإنّيْ حَرَّمْتُ الْمَدِيْنَةَ" “নিশ্চয়ই ইবরাহীম মক্কাকে হারাম বলে ঘোষণা দিয়েছেন, অবশ্যই আমি মদীনাকে হারাম ঘোষণা করলাম”। হাদীসটি ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন। ইব্রাহীম আলাইহিসসালাম এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দিকে হারামের সম্পর্ক করা দ্বারা উদ্দেশ্য হলোঃ তারা এ দু নগরী হারাম তথা সম্মানিত করার কথা ঘোষণা করেছেন নতুবা এ হারাম করা আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকেই, তিনিই এ মদীনাকে হারাম করেছেন যেমনিভাবে মক্কাকে (এর পূর্বে) হারাম করেছিলেন। আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়ার সমস্ত নগরীসমূহ থেকে কেবলমাত্র এ দুই নগরীকেই এ হারাম তথা সম্মানিত করার গুণে গুনান্বিত করেছেন। মক্কা ও মদীনা ব্যতীত আর কোন কিছুকে অনুরূপ হারাম করার ঘোষণা গ্রহণযোগ্য দলীল দ্বারা প্রমাণিত হয়নি। কোন কোন মানুষের মুখে মুখে যে প্রচার-প্রসার হয়ে পড়েছে যে, মাসজিদুল আকসা তথা বাইতুল মুকাদ্দাস তৃতীয় হারামাইন; এটা একটা বহুল প্রচলিত ভুল; কেননা হারামাইনের কোন তৃতীয় কিছু নেই, বরং বিশুদ্ধ কথা হলো এভাবে বলা যে, দুই মসজিদের পরে তৃতীয়টি, অর্থাৎ, সম্মানিত ও মর্যাদাপূর্ণ দুই মসজিদের পরে তৃতীয়টি হলো এ মসজিদ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস থেকে এ তিনটি মসজিদের ফযীলত ও নামাযের জন্য এগুলোর দিকে সফর করার ব্যাপারে দলীল প্রমাণাদি এসেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ

"لا تُشَدُّ الرِّحَالُ إلا إلى ثَلاثَةِ مَسَاجِدَ: اَلْمَسْجِدِ الْحَرَام، وَمَسْجِدِيْ هذا، وَالْمَسْجِدِ الأَقْصَى".
“তিন মসজিদ ব্যতীত অন্য কোন স্থানের দিকে (ইবাদতের জন্য) সফর করা যাবেনা; মসজিদে হারাম, আমার এ মসজিদ, আর মাসজিদুল আকসা (বাইতুল মুকাদ্দাস)”। হাদিসটি ইমাম বুখারী এবং ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন। মক্কা ও মদীনার হারাম দ্বারা উদ্দেশ্য হলোঃ এ দু'য়ের যতটুকু সীমানা নির্ধারিত করা হয়েছে তার সবটুকুই হারাম। হারাম বলতে শুধু মসজিদে নববী বুঝার যে প্রবণতা মানুষের মাঝে প্রসার লাভ করেছে তা বহুল প্রচলিত ভুলের অর্ন্তভূক্ত; কেননা শুধু মসজিদে নববীই হারাম নয়, বরং মদীনার (দক্ষিন পূর্ব দিক অবস্থিত) ‘আইর’ নামক পাহাড় হতে (দক্ষিন পশ্চিমে অবস্থিত) ‘সাওর’ নামক পাহাড় পর্যন্ত, আর (মাঝখানে পূর্ব ও পশ্চিমে কোনাকোনি ভাবে) দুই হাররা বা কালো পাথর বিশিষ্ট এলাকার মধ্যবর্তী সবটুকু স্থান হারামের অন্তর্ভূক্ত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ "اَلْمَدِيْنَةُ حَرَمٌ ما بَيْنَ عَيْرٍ إلى ثَوْرٍ" “মদীনা ‘আইর’ হতে ‘সাওর’ পর্যন্ত মধ্যবর্তী স্থানটুকু হারাম”। হাদীসটি ইমাম বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেছেনঃ
"إني حرمتُ ما بينَ لابَتَيِ المدينةِ أن يُقْطَعَ عِضاهُها، أو يُقْتَل صَيْدُها".
“আমি মদীনার দু’ হাররা বা কালো পাথর বিশিষ্ট জমিনের মাঝখানের অংশটুকু হারাম তথা সম্মানিত ঘোষণা দিলাম, এর কোন গাছ কাটা যাবেনা, কোন শিকারী জন্তু হত্যা করা যাবেনা”। ইমাম মুসলিম হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। মদীনা নগরী বর্তমানে বি¯তৃতি লাভ করার কারনে এর অংশবিশেষ হারাম ঘোষিত এলাকার বাইরে চলে গেছে, তাই মদীনা নগরীর যত বিল্ডিং আছে সবই হারাম এলাকার ভিতরে আছে এমনটি বলা যাবেনা, বরং যতটুকু হারাম ঘোষিত এলাকার ভিতরে পড়বে ততটুকুই হারাম, আর যে অংশ হারাম ঘোষিত এলাকার বাইরে আছে তাকে মদীনা নগরীর অংশ বলা হবে, হারামের অংশ বলা হবে না। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে মদীনার হারামের সীমা নির্ধারনে বিভিন্ন হাদীস এসেছে, কোন কোন হাদীসে বলা হয়েছে দুই কালো পাথর বিশিষ্ট এলাকার মাঝখানের অংশ হারাম, আবার কোথায়ও কোথায়ও বর্ণিত হয়েছে দু হাররার মাঝখানের অংশ হারাম, আবার কোন কোন বর্ণনায় এসেছে দু’পাহাড়ের মাঝখানের অংশ হারাম, অন্য বর্ণনায় এসেছে ‘আইর’ পাহাড় থেকে ‘সাওর’ পাহাড়ের মাঝখানের অংশ হারাম। এ শব্দগুলোর মধ্যে কোন বৈপরীত্ব নেই; কেননা যে কোন জিনিসের ছোট অংশ তার বড় অংশের অন্তর্গত। সুতরাং দু কালো পাথর বিশিষ্ট অংশের মাঝখানের অংশ হারাম, দু র্হারার মাঝখানের অংশ হারাম, ‘আইর’ ও ‘সাওর’ পর্বতদ্বয়ের মাঝখানের অংশ হারাম। এক্ষেত্রে যদি কোন অংশ হারামের ভিতরে পড়ল কিনা তাতে সন্দেহ এসে যায় তখন সবচেয়ে উত্তম পদ্ধতি হলোঃ এ কথা বলা যে, এটা সন্দেহযুক্ত ব্যাপার সমূহের একটি, আর নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ‘সন্দেহযুক্ত’ বিষয়ের ব্যাপারে যে নীতি অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন সেক্ষেত্রে তা মেনে চলা উচিত, আর তা হলো, এ ব্যাপারে চরম সাবধানতা অবলম্বন করা। যেমনটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে প্রখ্যাত সাহাবী নু‘মান বিন বাশীর রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসে বলেছেনঃ "فمنِ اتَّقى الشُّبهات فَقَدِ اسْتَبْرَأَ لِدِيْنِهِ وعِرضِه، وَمَنْ وقَعَ في الشُّبُهَاتِ وَقَعَ فِي الْحَرَامِ". “যে ব্যক্তি সন্দেহযুক্ত ব্যাপার সমুহ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছে সে নিজের দ্বীন ও সম্মানকে দোষমুক্ত করতে পেরেছে, আর যে ব্যক্তি সন্দেহযুক্ত ব্যাপার সমুহে নিপতিত হয়েছে সে হারামে পতিত হয়েছে”। *-এ বরকতময় মদীনার অপর যে সমস্ত ফযীলত আছে, তম্মধ্যেঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনার নাম রেখেছেন ‘ত্বাইবাহ’ বা পবিত্র, আরেক নাম ‘ত্বাবাহ’ বা পছন্দনীয়। বরং সহীহ মুসলিমের হাদীসে প্রমাণিত যে, আল্লাহ তা‘আলা এর নাম রেখেছেন ‘ত্বা-বা’, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ "إن اللهَ سمََّى الْمَدِيْنَةَ طَابَةً" “নিশ্চয়ই আল্লাহ মদীনাকে ‘ত্বা-বা নামে নামকরণ করেছেন”। ত্বা-বা ও ত্বাইবাহ এ দুটো শব্দই আরবী তাইয়্যব শব্দ থেকে নির্গত, যার অর্থ ‘ভালো’ বা ‘উত্তম’। সুতরাং এ দু’টি শব্দ উত্তম জায়গার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে।

  • *-এ মদীনার ফযীলতের মধ্যে আরো আছে যে, ঈমান এর দিকে ফিরে আসবে, যেমন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ "إنَّ الإِيْمَانَ لَيَأْرِزُ إلى المَدِيْنَةِ كما تَأْرِزُ الحيَّةُ إلى جُحْرِها" “নিশ্চয়ই ঈমান মদীনার দিকে ফিরে আসবে যেমনিভাবে সাপ তার গর্তে ফিরে আসে”। হাদিসটি ইমাম বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন। হাদীসের অর্থ হলোঃ ঈমান মদীনা অভিমুখী হবে, এবং মদীনাতে অবশিষ্ট থাকবে, আর মুসলমানগণ মদীনার উদ্দেশ্যে বের হবে এবং মদীনামুখী হবে, তাদেরকে তাদের ঈমান ও এ বরকতময় যমীনের প্রতি ভালোবাসা-যাকে মহান আল্লাহ হারাম ঘোষণা করেছেন-এ কাজে প্রবৃত্ত করবে। *-এ মদীনার ফযীলতের মধ্যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে আরো এসেছে, তিনি এ নগরী সম্পর্কে বলেছেন, এটা এমন একটা জনপদ যা যাবতীয় জনপদকে গ্রাস করে ফেলবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ "أُمِرْتُ بِقَرْيَةٍ تَأْكُلُ القُرى" يقولون لها : يَثْرِب، وهي المدينةُ" “আমাকে এমন জনপদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে যা সমস্ত জনপদকে গ্রাস করে ফেলবে” অর্থাৎ, তাকে এ জনপদের দিকে হিজরতের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে যা সমস্ত জনপদকে খেয়ে ফেলবে, “তারা তাকে ইয়াসরিব বলে ডাকে আসলে তা হলো মদীনা”। হাদীসটি ইমাম বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন। এখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথাঃ “সমস্ত জনপদ গ্রাস করে ফেলবে” এর এ অর্থ করা হয়েছে যে, এ জনপদ সমস্ত জনপদের উপর জয়ী হবে, এবং সমস্ত জনপদের উপর এর বিজয় অবশ্যম্ভাবী হবে। আবার এ অর্থও করা হয়েছে যে, এর দিকে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের কারণে প্রাপ্ত গনীমতের মালসমুহ নিয়ে আসা হবে, এবং এর দিকে স্থানান্তর করা হবে। বস্তুত এ দু’টি অর্থই শুদ্ধ; কেননা দু’টি কাজই ঘটেছিল এবং অর্জিত হয়েছিল। অন্যান্য নগরীর উপর এ মদীনা নগরীর বিজয় এভাবে হয়েছিল যে, এখান থেকেই হিদায়াতের মশালবাহী সংস্কারকগণ, দিগ্বিজয়ী যোদ্ধাগণ বের হয়ে পড়েছিলেন এবং মানুষকে আল্লাহর নির্দেশে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে এনেছিলেন, ফলে মানুষ আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করেছে, দুনিয়ার বুকে যত কল্যাণ হয়েছে তার সবটুকুই এ মদীনা তথা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মদীনা থেকেই অর্জিত হয়েছে। সুতরাং বুঝা গেল, “সমস্ত জনপদ গ্রাস করে ফেলবে” এ কথা দ্বারা যাবতীয় নগরীর উপর এ নগরীর বিজয় সাধিত হওয়া বুঝানো হয়েছে। ইসলামের প্রাথমিক যুগে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীদের প্রথম সারির সময়ে, অনুরূপভাবে খোলাফায়ে রাশেদীন রাদিয়াল্লাহু আনহুম ওয়া আরদাহুমের খিলাফত কালে এ ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হয়েছিল। অনুরূপভাবে যদি “সমস্ত জনপদ খেয়ে ফেলবে” দ্বারা গণীমতের মাল (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ) অর্জিত হওয়া ও মদীনায় আনা উদ্দেশ্য হয় তবে তাও ইসলামের প্রাথমিক যুগে হাসিল হয়েছিল; কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পুর্বাহ্নে সুসংবাদ জানিয়েছিলেন যে, রোম সম্রাট সীজার, আর পারস্য সম্রাট খসরূর যাবতীয় পুঞ্জিভুত সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় মুসলমানগণ ব্যয় করবে। আর সে ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে ফলে গিয়েছিল; এ সমস্ত সম্পদ এ বরকতময় মদীনায় নিয়ে আসা হয়েছিল, আর আমীরুল মুমেনীন উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু আনহু ওয়া আরদাহুর সময় তার হাতে তা বন্টন করা হয়েছিল। *-মদীনার ফযীলতের মধ্যে আরো আছে যে, এর মধ্যে অবস্থানের কারণে যে ব্যক্তি কষ্ট ও দৈন্যে পতিত হবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ধৈর্য্য ধারণ করার প্রতি উৎসাহিত করেছেন, তিনি বলেনঃ "المَدِيْنَةُ خَيْرٌ لَّهُمْ لَوْ كَانُوْا يَعْلَمُوْنَ" “নিশ্চয়ই মদীনা তাদের জন্য উত্তম যদি তারা তা জানত”। তিনি এ কথা ঐ সমস্ত লোকদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন যারা ভাল জীবিকা, প্রাচুর্য্য ও ধন-সম্পদের আশায় মদীনা ছেড়ে চলে যাবার চিন্তা-ভাবনা করছিল। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ

"اَلْمَدِيْنَةُ خيرٌ لهم لو كانوا يَعْلَمُون، لا يَدَعُها أحدٌ رغبةً عنها إلا أبدَلَ الله فيها مَنْ هو خيرٌ منه، ولا يثبُتُ أحدٌ على لأْوائها وجَهْدِها إلا كنتُ لهُ شَفيعاً أو شهيداً يومَ القيامةِ"
“মদীনা তাদের জন্য উত্তম যদি তারা তা জানত । এ মদীনা থেকে বিমুখ হয়ে যদি কেউ অন্য কোন দিকে চলে যায় আল্লাহ মদীনাতে তার থেকে ভালো বিকল্প লোকের ব্যবস্থা করে দিবেন, আর যদি কেউ এর যাবতীয় বালা-মুসীবত ও কষ্টের উপর ধৈর্য ধারণ করে তার জন্য আমি কিয়ামতের দিনে সুপারিশকারী বা সাক্ষী হব”। ইমাম মুসলিম হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। এ হাদীস দ্বারা আমরা মদীনার বিশেষ ফযীলতের প্রমাণ পাই, যেমনিভাবে এ মদীনাতে যদি কেউ কষ্ট, বালা-মুসীবত, আর্থিক দৈন্যতা, বিপদাপদে পতিত হয়ে ধৈর্য ধারণ করে তবে তার কি ফযীলত তার বর্ণনা দেয়া হয়েছে। সুতরাং বালা-মুসিবত, বা আর্থিক দৈন্যতার কারণে উন্নত জীবিকা, আর্থিক স্বচ্ছলতার জন্য যেন কেউ এ মদীনা নগরী ছেড়ে অন্য কোন দিকে যাওয়ার মনস্থ না করে, বরং সে মদীনাতে সামান্য যা পায় তার উপর ধৈর্য্য ধারণ করবে, এর বিনিময়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে তার জন্য মহা প্রতিদান, বিরাট সওয়াবের ওয়াদা করা হয়েছে। *- মদীনার ফযীলতের মধ্যে আরেকটি বিষয় বিশেষ গুরূত্বপূর্ণ, তাহলো এই যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ মদীনার বিশেষ মর্যাদা বর্ণনা করেছেন আর মদীনাকে হারাম ঘোষণার প্রাক্কালে এর মধ্যে কোন বিদ‘আত বা অন্যায় ঘটনা ঘটানোর ভয়াবহতা সম্পর্কে সাবধান করেছেন, তিনি বলেছেনঃ
"المَدِينَةُ حرمٌ ما بينَ عَيْرٍ إلى ثَوْرٍ، مَنْ أَحْدَثَ فيها حدَثاً أو آوَى مُحدِثاً فعليهِ لعْنَةُ الله والملائكةِ والناسِ أجمعينَ، لا يقبلُ الله منهُ صَرْفاً ولا عدْلاً"
“মদীনা ‘আ’ইর’ থেকে ‘সাওর’ পর্যন্ত হারাম, যে ব্যক্তি মদীনায় কোন অন্যায় কাজ করে অথবা কোন অন্যায়কারীকে আশ্রয় প্রদান করবে তার উপর আল্লাহ, ফেরেশ্তাগণ এবং সমস্ত মানুষের লা‘নত পড়বে। তার কাছ থেকে আল্লাহ কোন ফরয ও নফল কিছুই কবুল করবেন না”। হাদীসটি বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন। *-মদীনার ফযীলতের মধ্যে আরো আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জন্য বরকতের দো’আ করেছেন, তম্মধ্যে আছে তার বাণীঃ
اَللَّهمِّ بارِك لنا في ثَمَرِنا، وبارِكْ لنا في مَدِيْنَتِنَا، وبارِك لنا في صاعِنا، وبارِكْ لنا في مُدِّنا.
“হে আল্লাহ! তুমি আমাদের ফল-ফলাদিতে বরকত দাও। আমাদের এ মদীনায় বরকত দাও। আমাদের ছা’ পরিমাণ বস্তুতেও বরকত দাও, আমাদের মুদ পরিমাণ জিনিসেও বরকত দাও”। *-মদীনার ফযীলতের মধ্যে আরো আছে যে, এর মধ্যে মহামারী এবং দাজ্জাল প্রবেশ করতে পারবেনা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ "على أَنْقابِ المدينةِ ملائكةٌ، لا يَدْخُلُهَا الطَّاعُونُ ولا الدَّجَّالُ. “মদীনার প্রবেশ দ্বার সমূহে ফেরেশ্তা প্রহরী নিযুক্ত আছে, এতে মহামারী ও দাজ্জাল প্রবেশ করতে পারবেনা”। হাদীসটি ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন। মদীনার ফযীলতের উপর অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে, এখানে যা উল্লেখ করেছি তার সব কয়টিই সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম থেকে অথবা তার যে কোন একটি থেকে উল্লেখ করেছি। মদীনার ফযীলত বর্ণনায় সবচেয়ে ভালো কিতাবগুলোর মধ্যে শাইখ ডঃ সালেহ ইবনে হামেদ আর রিফা’য়ী কতৃক উপস্থাপিত কিতাব। তিনি মদীনাস্থ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় হতে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভের জন্য এ কিতাবটি লিখেছিলেন, যার শিরোনাম ছিলঃ
"الأحاديث الواردة في فضائل المدينة جمعاً ودراسةً"
“মদীনার ফযীলত বর্ণনায় যে সমস্ত হাদীস বর্ণিত হয়েছে তার সংকলণ ও পর্যালোচনা”। আর তাই আমি ছাত্রদেরকে আলোচ্য বইটির প্রতি দৃষ্টিদান ও তার থেকে ফায়েদা হাসিলের উপদেশ দিচ্ছি। এ মদীনা যে বিশেষ বিশেষ বস্তু সম্বলিত, তম্মধ্যে রয়েছে মহান দু’টি মসজিদ- ১) রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মসজিদ। ২) মসজিদে কুবা। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মসজিদের ফযীলত বর্ণনায় অনেক হাদীস এসেছে, তম্মধ্যে আছে রাসূলের বাণীঃ
"لا تُشَدُّ الرِّحَالُ إلا إلى ثَلاثَةِ مَسَاجِدَ: اَلْمَسْجِدِ الْحَرَام، وَمَسْجِدِيْ هذا، وَالْمَسْجِدِ الأَقْصَى".
“তিনটি মসজিদ ব্যতীত অন্য কোথায়ও (সওয়াব/ ইবাদতের আশায়) সফর করা জায়েয নেইঃ মাসজিদুল হারাম, আমার এ মসজিদ, আর মাসজিদুল আক্সা”। হাদিসটি ইমাম বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন। সুতরাং নবীরা যে সমস্ত মসজিদ বানিয়েছে এবং যেগুলির দিকেই (সওয়াবের উদ্দেশ্যে) কেবলমাত্র সফর করা যায় এ মদীনাতে তার একটি বিদ্যমান। এ মসজিদে সালাত আদায় করার যে ফযীলত রয়েছে সে সম্পর্কেও হাদীসে এসেছে যে, এক হাজার সালাতের চেয়েও উত্তম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
"صَلاَةٌ في مَسْجِدِيْ هذا أفْضَلُ مِنْ ألفِ صلاةٍ فيما سواه إلا المسجِدِ الْحَرَامِ".
“আমার এ মসজিদে এক সালাত আদায় করা মসজিদে হারাম ব্যতীত অন্যান্য মসজিদে এক হাজার সালাত আদায় করার চেয়েও উত্তম”। হাদীসটি ইমাম বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন। সুতরাং এ এক বিরাট ফযীলত, আখেরাতের মাওসুমের একটি মাওসুম, যেখানে বহুগুণ বর্ধিত হারে লাভবান হওয়া যায়, দশগুণ বা শতগুণ হিসাবে নয় বরং এর সওয়াব হাজার গুণের বেশি। জানা কথা, দুনিয়ার ব্যবসায়ীরা যখন জানতে পারে যে, তাদের কোন কোন পণ্য নির্দিষ্ট কোন স্থানে, নির্দিষ্ট কোন সময়ে খুব ভালো চলবে, তখন তারা সে মওসুম ধরার জন্য যাবতীয় প্রস্তুতিসহ আগ থেকেই তৈরী হয়ে থাকে, যদিও সেখানে তাদের লাভের ভাগ আধাআধি বা দ্বিগুণ হয়ে থাকে, এ যদি হয় দুনিয়ার ব্যবসায় আমাদের অবস্থা তাহলে আমাদের কি রকম প্রস্তুতি থাকা দরকার যেখানে আখেরাতের লাভের ঘোষণা দেয়া হয়েছে, আর লাভের মাত্রা দশগুণ বা একশ’গুণ বা পাঁচশ’গুণ বা ছয়শ’গুণ নয় বরং হাজার গুণেরও বেশী!!
মসজিদে নববীর সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ
একঃ এ মসজিদে নামায পড়লে হাজার গুণের চেয়ে বর্ধিত হারে সওয়াব দেয়ার ব্যাপারটা শুধু ফরয নামাযের সাথে বিশেষিত নয়, যেমনিভাবে শুধু নাফল নামাযের সাথে সংশ্লিষ্ট নয়, বরং ফরয ও নাফল যাবতীয় নামাযের ক্ষেত্রেই তা প্রযোজ্য; কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ব্যাপারে শুধু “নামায” বলে উম্মুক্ত ঘোষণা দিয়েছেন। সুতরাং প্রত্যেক ফরয নামায এক হাজার ফরয নামাযের পরিমাণ, আর প্রত্যেক নাফল নামায এক হাজার নাফল নামাযের অনুরূপ। দুইঃ মসজিদের সালাত আদায়ে যে বহুগুণ বর্ধিত হারে সওয়াব পাওয়া যাবে বলা হয়েছে তা শুধু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময়ে যতটুকু মসজিদের ভূমি নির্দিষ্ট ছিল ততটুকুর মধ্যে হতে হবে এমন নয় বরং যতটুকু ভূমি রাসূলের সময়ে মসজিদ হিসাবে গণ্য ছিল তা ছাড়াও যতবার তা বাড়ানো হয়েছে সমস্ত বর্ধিত অংশেই এ সওয়াব পাওয়া যাবে। এর প্রমাণ আমরা পাই খলিফা উমর ও উসমান (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা)র কর্মকান্ডে, তাদের সময়ে এই মসজিদ সামনের দিকে বাড়ানো হয়েছিল, আর জানা কথা যে, যে অংশ বর্ধিত করা হয়েছিল সে অংশে ইমাম সাহেব এবং প্রথম কাতারগুলো দাঁড়ায়, যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময়ের মসজিদের বাইরের অংশ। যদি বর্ধিত অংশের হুকুম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময়ের মসজিদের হুকুম না হতো তা হলে এ দু’জন সম্মানিত খলিফা কোনভাবেই মসজিদকে সামনের দিকে বাড়াতেন না। তদুপরি সাহাবাগণ তখন জীবিত ছিলেন, তাদের মধ্য থেকে কেউ তাদের এ বর্ধিত করণের বিরোধিতা করেননি। এ সব কিছুই প্রমাণ বহন করে যে, সালাত বহুগুণ বর্ধিত হওয়া শুধু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগের মসজিদের অংশের সাথে বিশেষিত নয়। তিনঃ এ মসজিদে এমন এক টুকরো জমিন রয়েছে যাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জান্নাতের উদ্যানসমূহের একটি উদ্যান বলে বিশেষিত করেছেন। তিনি বলেছেনঃ
"ما بينَ بَيْتِيْ ومِنْبَرِيْ رَوضَةٌ من رِيَاضِ الجَنَّةٍ"
“আমার ঘরের এবং আমার মিম্বরের মাঝখানের অংশটুকু জান্নাতের উদ্যানসমুহের একটি উদ্যান”। ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক মসজিদের এ অংশকে অন্যান্য অংশ থেকে পৃথক গুণে গুণান্বিত করা দ্বারা এ অংশের আলাদা ফযীলত ও বিশেষ শ্রেষ্টত্বের উপর প্রমাণ বহন করছে। আর সে শ্রেষ্টত্ব ও ফযীলত অর্জিত হবে কাউকে কষ্ট না দিয়ে সেখানে নফল নামায আদায় করা, আল্লাহর যিকর করা, কুরআন পাঠ করা দ্বারা। কিন্তু ফরয নামায প্রথম কাতারগুলোতে পড়া উত্তম; কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
"خيرُ صُفُوفِ الرِّجالِ أوّلها وشرُّها آخرها" “পুরুষদের সবচেয়ে উত্তম কাতার হলো প্রথমটি, আর সবচেয়ে খারাপ কাতার হলো শেষটি” ইমাম মুসলিম হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরোও বলেনঃ
"لو يَعْلَمُ النّاسُ ما في النّداء والصَّفِّ الأولِ، ثُمَّ لَمْ يَجِدُوْا إلا أَن يَّسْْتَهِمُوا عليه لاسْتَهَمُوْا عَلَيْه".
“যদি মানুষ আজান ও প্রথম কাতারের ফযীলত জানত, তারপর লটারী করা ব্যতীত তা পাওয়ার সম্ভাবণা না থাকত তাহলে তারা অবশ্যই তার জন্য লটারী করত”। ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম এ হাদীসখানি বর্ণনা করেছেন।

চারঃ যদি নামাযীদের দ্বারা মসজিদ পূর্ণ হয়ে যায় তাহলে যারা পরে আগমন করবে তারা ইমামের সামনের দিকে বাদ দিয়ে তিন দিক থেকে রাস্তায়ও ইমামের নামাযের সাথে নামায আদায় করতে পারবে, এবং জামা‘আতে নামায আদায়ের ফযীলত পাবে। কিন্তু হাজার গুণ বর্ধিত হারে সওয়াব পাওয়ার অধিকারী কেবলমাত্র ঐ সমস্ত লোকেরাই হবে যাদের নামায মসজিদের সীমার মধ্যে ছিল; কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
"صَلاةٌ في مَسْجِدِيْ هذا خَيْرٌ مِّن ألفِ صلاةٍ فيما سواه إلا الْمَسْجِدِ الحَرامِ".
“আমার এ মসজিদে এক নামায মসজিদে হারাম ব্যতীত অন্যান্য মসজিদে এক হাজার নামাযের চেয়েও উত্তম”, যে ব্যক্তি আশে পাশের রাস্তায় নামায পড়ল সে মসজিদে নামায আদায়কারীর মধ্যে গণ্য হলো না। সুতরাং সে এ বহুগুণ সওয়াবের অধিকারী হবে না।

পাঁচঃ মানুষের মধ্যে একটি ধারণা ব্যাপকভাবে প্রসার লাভ করেছে যে, যদি কেউ মদীনায় আসে তাহলে সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মসজিদে চল্লিশ ওয়াক্ত নামায আদায় করতে হবে, তাদের দলীল ইমাম আহমাদ এর মুসনাদে উল্লেখিত এক হাদীস, যা সাহাবী আনাস ইবনে মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
"مَنْ صلّى في مَسْجِدِيْ أَرْبَعينَ صَلاةً لا تفوتهُ صلاةٌ كُتبت له براءةٌ من النار ونجاةٌ من العذاب، وبَرِئَ من النِّفاقِ".
“যে আমার এ মসজিদে চল্লিশ ওয়াক্ত নামায এমনভাবে পড়বে যে এর মাঝে কোন একটি নামাযও ছুটে যাবে না তার জন্য জাহান্নাম থেকে নিস্কৃতি, শাস্তি থেকে নাজাত এবং মুনাফেকী থেকে মুক্তি লিখা হবে”। এ হাদীসটি দুর্বল, এর দ্বারা প্রমাণ পেশ করা যায় না, এ ব্যাপারে শরীয়তের হুকুম প্রশস্ত, কেউ মদীনায় আসলেই তার উপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মসজিদে নির্দিষ্ট পরিমাণ নামায পড়া বাধ্যতামুলক নয়, বরং কোন প্রকার নির্ধারণ বা সুনির্দিষ্ট সংখ্যক নামাযের সাথে বিশেষিত করা ছাড়াই এ মসজিদে প্রত্যেক নামায এক হাজার নামাযের চেয়ে উত্তম।

ছয়ঃ ইসলামী বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে মুসলমানগণ কবরের উপর মসজিদ তৈরী, বা মৃতদেরকে মসজিদে দাফনের মত গর্হিত কাজে লিপ্ত হয়ে পড়েছে। তাদের কেউ কেউ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মসজিদের মধ্যে তার কবর আছে বলে দলীল নিতে চেষ্টা করে। তাদের এ ভ্রান্ত ধারণার জবাবে বলা হবে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন প্রথম মদীনায় আগমন করেন তখন এ মসজিদ বানিয়েছিলেন, তার এ মসজিদের পার্শ্বেই তিনি তার ঘর বানিয়েছিলেন যেখানে মু’মিনদের মাতা নবীর স্ত্রীগণ থাকতেন, তম্মধ্যে ছিল আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার ঘর, যে ঘরে রাসূলকে দাফন করা হয়েছে। খোলাফায়ে রাশেদীনের পূর্ণ সময়, আমীরে মু‘য়াবীয়া রাদিয়াল্লাহু আনহুর সময়, এমনকি পরবর্তী আরো কয়েকজন খলিফার খিলাফত কালেও এ সমস্ত ঘর মসজিদের বাইরে ছিল। বনী উমাইয়া খলিফাদের সময়ে মসজিদে নববীকে স¤প্রসারণ করা হয় এবং আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার ঘর যেখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কবর বিদ্যমান তাও মসজিদের গন্ডির ভিতর ঢুকানো হয়।
অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে (রহিত নয় এমন) বহু সুস্পষ্ট হাদীস বর্ণিত হয়েছে সেগুলো দ্বারা কবরকে মসজিদ বানাতে নিষেধ করা হয়েছে, তম্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোঃ জুনদুব ইবনে আবদুল্লাহ আল বাজালী রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীস, তিনি বলেনঃ আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে তার মৃত্যুর পাঁচ রাত্রি পূর্বে বলতে শুনেছিঃ
"إِنّي أبرأُ إلى اللهِ أن يكون لِيْ منكُم خليلٌ، فإن الله اتخذني خليلاً كما اتخذ إبراهيمَ خَليْلاً، ولو كنتُ متخذاً من أمَّتِيْ خَلِيْلاً لاتَّخذْتُ أبا بكرٍ خليلاً، ألا وإنَّ من كان قبلكم كانوا يتخذون قبورَ أنبيائهم وصالحيهم مساجدَ، ألا فلا تتخذوا القبورَ مساجدَ فإنّي أنهاكُمْ عَنْ ذلكَ"
“আমি তোমাদের কারও অন্তরঙ্গ বন্ধু (খলীল) হওয়া থেকে আল্লাহর কাছে মুক্তি চাচ্ছি; কেননা আল্লাহ আমাকে খলীল বা অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করেছেন যেমনিভাবে ইব্রাহীমকে খলীল হিসাবে গ্রহণ করেছেন। আর যদি আমি আমার উম্মতের কাউকে খলীল হিসাবে গ্রহণ করতাম তাহলে আবু বকরকেই খলীল হিসাবে গ্রহণ করতাম। সাবধান! নিশ্চয়ই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা তাদের নবীদের এবং সৎলোকদের কবরকে মসজিদ বানিয়ে নিত, সাবধান! তোমরা কবরসমুহকে মসজিদ বানিওনা কেননা আমি তোমাদেরকে তা থেকে নিষেধ করছি”। ইমাম মুসলিম হাদীসখানি তার সহীহ্ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। বরং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মৃত্যুর সন্ধিক্ষণেও কবরকে মসজিদ বানাতে নিষেধ করেছিলেন। যেমন সহীহ বুখারী ও মুসলিমে আয়েশা ও ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত হয়েছে তারা বলেছেনঃ যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর মৃত্যু উপনিত হচ্ছিল, তিনি তাঁর মুখের উপর একখানি চাদর ফেলছিলেন, তারপর যখন হুশ হলো তখন মুখ থেকে তা সরিয়ে ফেললেন এবং বললেনঃ -অথচ তিনি সেই মারাত্মক অবস্থায় ছিলেন-
"لَعْنَةُ اللهِ على الْيَهودِ والنصارَى اتَّخَذُوا قُبُوْرَ أَنْبِيائِهِمْ مَسَاجِدَ"
“ইয়াহুদ ও নাসারাদের উপর আল্লাহর অভিসম্পাত, তারা তাদের নবীদের কবরসমুহকে মসজিদে রূপান্তরিত করেছে” তারা যা করেছে তা থেকে সাবধান করাই ছিল নবীর উদ্দেশ্য। আয়েশা, ইবনে আব্বাস এবং জুনদুব রাদিয়াল্লাহু আনহুম থেকে বর্ণিত হাদীসগুলো এমনই অকাট্য যে সেগুলো কোন অবস্থাতেই রহিত হওয়া সম্ভব নয়; কেননা জুনদুব রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসখানি ছিল রাসূলের শেষ দিনগুলোর, আর আয়েশা ও ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমার হাদীস ছিল মৃত্যুর শেষ সন্ধিক্ষণে। সুতরাং ব্যক্তি বা দলগোষ্ঠী কোন মুসলমানের জন্যই এটা বৈধ নয় যে, রাসূল থেকে অকাট্যভাবে সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত বিষয় ত্যাগ করে বনী উমাইয়াদের যুগে যা ঘটেছিল সেটার অনুসরণ করবে, কেননা বনী উমাইয়াদের যুগেই কবরকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মসজিদের অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছিল, সুতরাং এর দ্বারা প্রমাণ নেয়া সিদ্ধ নয় যে, কবরের উপর মসজিদ বানানো, বা মসজিদের মধ্যে মৃতব্যক্তিদের দাফন করা যাবে।

মসজিদে কুবাঃ যা এ মদীনা নগরীর সে দু’ মসজিদের অন্তর্গত যে মসজিদ দু’টির ফযীলত ও উচ্চ মর্যাদা রয়েছে। মুলতঃ ইসলামের প্রথম দিন থেকেই এ দু’টি মসজিদ তাকওয়ার ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে কথা ও কাজের মাধ্যমে এ মসজিদের মধ্যে নামায পড়ার ফযীলত প্রমাণিত হয়েছে। রাসূলের কাজঃ আব্দুল্লাহ ইবনে উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রত্যেক সপ্তাহে মসজিদে কুবায় পায়ে হেটে এবং বাহনে চড়ে আসতেন তারপর সেখানে দু’রাকাত নামায পড়তেন। হাদীসখানি ইমাম বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন।

রাসূলের কথাঃ সাহল ইবনে হুনাইফ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
"مَنْ تَطهَّرَ في بَيْتِِه ثمَّ أتَى مسْجِدَ قباءَ فصلّى فيه صلاةً كان له أَجْرُ عُمْرَةٍ"
“যে ব্যক্তি তার নিজ ঘরে পবিত্রতা অর্জন করবে তারপর মসজিদে কুবাতে আসার পরে সেখানে কোন নামায পড়বে সেটা তার জন্য একটি উম্রার সওয়াব হিসাবে গণ্য হবে”। হাদীসটি ইমাম ইবনে মাজাহ ও অন্যান্যরা বর্ণনা করেছেন। এখানে রাসূলের কথা “সেখানে কোন নামায পড়বে” এর দ্বারা ফরয ও নফল যাবতীয় নামাযই শামিল করে। এ দু’ মসজিদ ব্যতীত মদীনার অপরাপর কোন মসজিদে নামায পড়ার ফযীলত হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়নি।

মদীনায় বসবাসের আদবসমুহ

যাকে আল্লাহ তা‘আলা এ মুবারক মদীনা, ত্বাইবাতুত্তাইবায় বসবাস করার তাওফীক দিয়েছেন তার এটা উপলব্ধি করা ওয়াজিব যে, সে বিরাট এক নে‘আমতের অধিকারী হয়েছে, বিরাট ইহসান তার উপর রয়েছে, ফলে সে এ নে‘আমতের শুকরিয়া আদায় করবে, আল্লাহর এ দয়া ও রহমাতের কারণে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হবে। সে যেন এটা উপলব্ধি করে যে, জগতের অধিবাসীদের অনেকেই সামান্য সময়ের জন্য হলেও মক্কা ও মদীনা আসার ও অবস্থান করার ইচ্ছা পোষন করে। আবার তাদের মধ্যে এমনও আছে যে, বছরের পর বছর ধরে সামান্য কিছু টাকা অল্প অল্প করে জমাতে থাকে যাতে তাদের এ আশা পূর্ণ হয়। আমার মনে পড়ে ভারতবর্ষীয় একজন আলেম আমাকে বলেছিলেনঃ পূর্বকালে ভারতবর্ষীয় হাজী সাহেবগণ পাল তোলা পানি জাহাজে চড়ে আসতেন, মক্কা ও মদীনা আসার আগে তারা অনেক লম্বা সময় ধরে সাগর বক্ষে অবস্থান করতেন, তাদের মধ্যে একদল লোক পানি জাহাজে ছিল, মক্কা ও মদীনার শুষ্ক ভুমি তাদের নজরে পড়ার সাথে সাথে তারা আল্লাহর শুকরিয়ায় জাহাজের উপরে সিজদায় পড়ে গিয়েছিল।

এ মদীনায় বসবাসের কিছু আদাব রয়েছে, যেমনঃ

প্রথমতঃ মুসলিম যেন এ মদীনাকে তার ফযীলত এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভালবাসার কারণে ভালবাসে। ইমাম বুখারী তার সহীহ গ্রন্থে আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণনা করেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কোন সফর থেকে আসতেন আর মদীনার ঘর বাড়ী তার নজরে পড়ত তখন তিনি বাহনের গতি বাড়িয়ে দিতেন, আর যদি তিনি সওয়ারীর পিঠে থাকতেন তাকে তাড়াতাড়ি চালাতেন মদীনার মহব্বতের কারণে।

দ্বিতীয়তঃ মুসলিম যেন এ মদীনাতে আল্লাহর দ্বীনের উপর অটুট থাকার ব্যাপারে যত্নবান হয়, আল্লাহর আনুগত্য ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যে পূর্ণভাবে নিয়োজিত থাকে। কোন প্রকার বিদ‘আত বা গুনাহের কাজ থেকে সদা সতর্ক থাকে; কেননা এ মদীনাতে নেক কাজ করা যেমনিভাবে বিরাট মর্যাদাপূর্ণ তেমনিভাবে এখানে বিদ‘আত ও গুনাহের কাজে লিপ্ত হওয়াও ভয়াবহ পরিণতির কারণ; কেননা যে ব্যক্তি হারাম এলাকায় আল্লাহর নাফরমানি করে সে হারাম এলাকার বাইরে নাফরমানি করার চেয়ে বেশী বড় ও কঠোর গুনাহগার। আর হারাম এলাকায় গুনাহ পরিমাণের দিক থেকে বর্ধিত না হলেও, মারাত্মক পরিণতি ও ভয়াবহতার দিক থেকে বর্ধিত হয়।

তৃতীয়তঃ মুসলিম যেন এ মদীনাতে অবস্থানকালে পরকালীন লাভের বিষয়ে বেশী যতœবান হয়, যেখানে বহুগুন বর্ধিত হারে সে লাভ অর্জন করতে পারে, আর সেটা সম্ভব এ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মসজিদে সাধ্যমত বেশী বেশী করে নামায আদায় করার মাধ্যমে; কেননা এতে করে সে বিরাট সওয়াবের অধিকারী হতে পারে। ইমাম বুখারী ও মুসলিম বর্ণিত হাদীসে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ “আমার এ মসজিদে এক নামায, মসজিদে হারাম ব্যতীত অন্যান্য মসজিদে এক হাজার নামাযের চেয়েও উত্তম”।

চতুর্থতঃ মুসলিম যেন এ মুবারক মদীনাতে কল্যাণ ও ভাল কাজের জন্য অনুকরণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়; কেননা সে এমন এক নগরীতে বসবাস করছে যেখান থেকে আলো দিগি¦দিকে ছড়িয়ে পড়েছিল, আর এখান থেকেই হিদায়াতের মশালবাহী সংস্কারকগণ জগতের চারিদিকে বের হয়েছিল। সুতরাং যারা এ মদীনার যিয়ারতে আসবে তারা এখানকার অধিবাসীদেরকে অনুসরণীয় চরিত্র, ভাল গুণে গুণান্বিত, মহান চরিত্রের অধিকারী হিসাবে দেখতে পাবে। এর ফলশ্র“তিতে তারা এখানে যা কিছু ভালো দেখতে পেয়েছে, আল্লাহর আনুগত্য ও তার রাসূলের আনুগত্যের মধ্যে যতটুকু যত্নবান দেখতে পেয়েছে ততটুকু দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তাদের দেশে ফিরে যাবে। অপরদিকে যেমনিভাবে এ মদীনার যিয়ারতকারী ভালো অনুসরনীয় বিষয় দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অনেক ভাল ও উন্নত ফায়েদা নিতে পারে তেমনিভাবে এর বিপরীতটাও হতে পারে যখন সে এ মদীনাতে এর বিপরীত কিছু দেখতে পাবে, তখন সে এ মদীনা দ্বারা উপকৃত ও প্রশংসাকারী হওয়ার পরিবর্তে ক্ষতিগ্রস্ত ও দুর্নামকারীতে রূপান্তরিত হবে।

পঞ্চমতঃ মুসলিম যেন স্মরণ করে যে সে মদীনায় অবস্থান করছে, সে এমন এক পূণ্য ভুমিতে অবতরণ করেছে যা ওহী অবতরণস্থল, ঈমানের ফিরে আসার স্থান, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবাসস্থল, আর তার সাহাবী মুহাজির ও আনসারগণ এখানে চলাফেরা করেছিল, এ ভূমিতেই তারা সততা, নিষ্ঠা, হক্ব ও হিদায়াতের সাথে জীবন ধারন করেছিল। সুতরাং এখানে এমন যাবতীয় কাজ থেকে সাবধান থাকা উচিত যা তাদের জীবন চরিতের বিপরীত হবে। যেমন কেউ এখানে আল্লাহ তা‘আলাকে অসন্তুষ্ট করে এমন কোন কর্মকান্ড করে বসল, ফলে সেটা তার জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে ক্ষতি ও মারাত্মক পরিণতির কারণ হয়ে যাবে।

ষষ্টতঃ যাকে আল্লাহ তা‘আলা এ মদীনাতে বসবাস করার তাওফীক দিয়েছেন সে যেন এখানে কোন প্রকার অন্যায় করা বা অন্যায়কারীকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া থেকে সাবধান থাকে; কারণ এটা করলে তাকে লা‘নতের সম্মুখীন হতে হবে; কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে প্রমাণিত হয়েছে তিনি বলেছেনঃ
"اَلْمَدِيْنَةُ حَرَمٌ، فَمَنْ أَحْدَثَ فيها حَدَثاً أو آوى مُحْدِثاً فَعَلَيْهِ لَعْنَةٌ اللهِ والملائكةِ والناسِ أجمعين، لا يُقْبَلُ منه يوم القيامة عَدْلٌ ولا صرفٌ".
“মদীনা হারাম, সুতরাং যে কেহ এতে খারাপ ঘটনা করবে বা খারাপ ঘটনাকারীকে আশ্রয় দিবে তার উপর আল্লাহ, ফেরেশ্তা এবং সমস্ত মানুষের লা‘নত পড়বে, কিয়ামতের দিন তার থেকে কোন ফরয বা নফল কিছুই গ্রহণ করা হবে না”। হাদীসটি ইমাম মুসলিম আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন, আর এটা সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে।

সপ্তমতঃ মদীনায় যেন কোন গাছ কাটা বা শিকারী জন্তু শিকার করার মত গর্হিত কাজ না করে; কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এ বিষয়ে বিভিন্ন হাদীস এসেছে, যেমন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
"إنَّ إبْراهِيْمَ حَرَّمَ مَكَّةَ وإنِّيْ حرَّمتُ الْمَدينةَ ما بين لاَبَتَيْهَا، لا يُقطع عِضَاهُهَا، ولا يُصادُ صَيْدُها".
“নিশ্চয়ই ইবরাহীম মাক্কাকে হারাম করেছেন আর আমি মদীনাকে এর দু কালো পাথর বিশিষ্ট ভূমির মাঝখানকে হারাম করলাম, এর গাছ কাটা যাবেনা, আর এর শিকারী জন্তুও শিকার করা যাবেনা”। ইমাম মুসলিম এ হাদীসটি সাহাবী জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণনা করেছেন। ইমাম মুসলিম সাহাবী সা‘দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকেও বর্ণনা করেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
"إني أُحرِّمُ ما بين لاَبتَيِ المَدينة أن يُقطَعَ عِضَاهُها، أو يُقْتَلَ صَيْدُها".
“আমি মদীনার দু’কালো পাথর বিশিষ্ট ভূমির মাঝখানটুকুতে গাছ কাটা অথবা শিকারী জন্তু হত্যা করা থেকে হারাম ঘোষণা করছি”। সহীহ বুখারী ও মুসলিমে আসিম ইবনে সুলাইমান আল আহওয়াল থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি সাহাবী আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বললামঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি মদীনাকে হারাম ঘোষণা করেছেন? তিনি বললেন; হাঁ, ওখান থেকে ওখান পর্যন্ত, এর গাছ কাটা যাবেনা, যে ব্যক্তি এর মধ্যে কোন অঘটন ঘটায় তার উপর আল্লাহ, ফেরেশ্তা এবং সমস্ত মানুষের লা‘নত পড়বে। সহীহ বুখারী ও মুসলিমে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলতেনঃ “আমি যদি মদীনাতে হরিণ চরতে দেখতাম তাহলেও তাকে ভয় দেখাতাম না, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
"مَا بَيْنَ لاَبَتَيْهَا حَرَامٌ" “এর দু’কালো পাথর বিশিষ্ট ভুমির মাঝখানটুকু হারাম”। এখানে ঐ গাছ কাটাই হারাম ঘোষণা করা হয়েছে যেগুলি আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে উৎপন্ন হয়ে থাকে, কিন্তু যে সমস্ত গাছ মানুষ নিজেরা রোপন করেছে সেগুলো তাদের জন্য কাটা জায়েয।

অষ্টমতঃ মুসলিম যেন মদীনায় তার উপর জীবনধারনের কষ্ট, বালা-মুসীবত ও বিপদাপদে ধৈর্য ধারণ করে; কেননা আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
"لا يَصِبِْرُ عَلَى لأْوَاءِ الْمَدِيْنَةِ وشِدَّّتِها أَحَدٌ مِّن أمّتي، إلا كُنْتُ لَهُ شَفِيْعاً يَوْمَ الْقِيَامِة أَوْ شَهِيْداً".
“আমার উম্মতের মধ্য হতে যে কেউই মদীনার কষ্ট, বালা-মুসীবতে ধৈর্য ধারণ করবে আমি তার জন্য সুপারিশকারী অথবা সাক্ষ্যদাতা হবো”। হাদীসটি ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন। সহীহ মুসলিমে আরও এসেছে যে, মাহরীর দাস আবু সা‘ঈদ নামীয় এক ব্যক্তি মদীনা লুটতরাজের যে ঘটনা ঘটেছিল সে রাতগুলোতে সাহাবী আবু সা‘ঈদ আল-খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে এসে মদীনাকে পরিত্যাগ করে চলে যাওয়ার ব্যাপারে পরামর্শ চাইলো, এবং মদীনায় জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি ও তার পরিবারের সদস্য সংখ্যা বেশী হওয়ার সমস্যার কথা তার কাছে অভিযোগ আকারে পেশ করলো, সে আরো জানাল যে, মদীনার কষ্ট, বিপদ ও সমস্যায় তার পক্ষে ধৈর্যধারণ করা সম্ভব নয়। তখন আবু সা‘ঈদ আল-খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেনঃ “তোমার জন্য আফসোস! তোমাকে আমি সে আদেশ করতে পারিনা, কারণ আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বলতে শুনেছিঃ
"لا يَصْبِرُ أَحَدٌ على لَأْوَائِهَا فَيَمُوْتُ إلا كُنْتُ لَهُ شَفِيْعاً يوم الْقِيَامةِ، إذا كَانَ مُسْلِماً".
“যে ব্যক্তি মদীনার কষ্টে ধৈর্য ধারণ করে তথায় মৃত্যু বরণ করবে কিয়ামতের দিন আমি তার জন্য শাফা‘আত করব, যদি সে মুসলমান হয়”।

নবমতঃ এ মদীনার অধিবাসীদের কষ্ট দেয়া থেকে সাবধান থাকা; কেননা মুসলমানদের কষ্ট দেয়া প্রত্যেক স্থানেই হারাম, আর পবিত্র স্থানে আরো বেশী মারাত্মক ও জঘন্য কাজ, ইমাম বুখারী তার সহীহ গ্রন্থে সাহাবী সা‘দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন তিনি বলেনঃ আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বলতে শুনেছিঃ
"لا يَكِيْدُ أَهْلَ المدينةِ أحدٌ إلا انْمَاعَ كما يَنْمَاعُ الْمِلْحُ في الْمَاءِ"
“মদীনাবাসীদের সাথে যে কেউ কোন ষড়যন্ত্র করবে সে লবণ যেভাবে পানিতে মিশে যায়, সেভাবে মিশে যাবে”। ইমাম মুসলিমও তার সহীহ গ্রন্থে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেনঃ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
"مَنْ أَرَادَ أَهْلَ هذهِ الْبَلْدَةَ بِسُوْءٍ ـ يعني المدينةَ ـ أَذَابَهُ اللهُ كَمَا يَذُوْبُ الْمِلْحُ في الْمَاءِ".
“যে ব্যক্তি এ নগরীর অধিবাসীদের অর্থাৎ, মদীনাবাসীদের কোন ক্ষতি করতে ইচ্ছা করবে আল্লাহ তাকে লবণ যেভাবে পানিতে গলে যায় তেমনিভাবে মিশিয়ে দিবেন”।

দশমতঃ মদীনার কোন অধিবাসী যেন মদীনাবাসী হওয়ার কারণে অহমিকাগ্রস্ত না হয়, যেমন বলে বসল যে, আমি মদীনাবাসী, আমি নেককার; কেননা যদি সৎকাজ না করে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যের উপর অটুট না থাকে, গুনাহ ও পাপাচার থেকে দুরে না থাকে তবে শুধুমাত্র মদীনার অধিবাসী হলে কোন উপকার হবেনা, বরং তা তার জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। ইমাম মালেক কতৃক প্রণিত মুয়াত্তায় সাহাবী সালমান আল-ফারেসী রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত তিনি বলেছেনঃ “নিশ্চয়ই ভূমি কাউকে পবিত্র করে না বরং মানুষকে তার আমল বা কর্মই পবিত্র করে”। এ হাদীসের বর্ণনা পরম্পরার মধ্যে ছেদ থাকলেও তার অর্থ বিশুদ্ধ, আর তা বাস্তবতার অনুকুল, আল্লাহ তা‘আলাও তা বলেছেনঃ ﴿إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ (الحجرات: ১৩) “নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সবচেয়ে সম্মানিত হলো যে সবচেয়ে বেশী তাক্ওয়ার অধিকারী” [সূরা আল হুজরাতঃ ১৩] ।

আর জানা কথা যে, যুগে যুগে মদীনায় ভাল লোকের সমাহার যেমন ঘটেছিল তেমনিভাবে খারাপ লোকেরও অস্তিত্ব ছিল। ভাল লোকদেরকে তাদের কর্মকান্ড উপকার দিবে, কিন্তু মন্দ লোকদেরকে মদীনা পবিত্র করবে না, তাদের অবস্থার উন্নতিও সাধিত হবে না। ব্যাপারটা বংশের মত, যেমনিভাবে কোন লোক সৎ কাজ ব্যতিরেকে শুধুমাত্র সদ্বংশীয় হলেই তা তার জন্য কোন উপকারে আসবেনা; যেমনটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
"مَنْ بَطّأَ بِهِ عَمَلُهُ لَمْ يُسْرِعْ بِه نَسَبُهُ" “আর যাকে তার আমল পিছিয়ে রেখেছে তাকে তার বংশ এগিয়ে দিবে না”। হাদীসটি ইমাম মুসলিম তার সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন।

সুতরাং যাকে তার আমল জান্নাতে প্রবেশ করতে পিছপা করবে তাকে তার বংশীয় পরিচয় জান্নাতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে না। এগারতমঃ মুসলিম যেন এটা উপলব্ধি করে যে, সে এ মদীনাতে আছে যে শহর থেকেই আলো বিচ্ছুরিত হয়েছিল, আর যাবতীয় উপকারী জ্ঞান এখান থেকেই সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল, সুতরাং সে যেন এখানে শরীয়তের জ্ঞান অর্জনে তৎপর থাকে, যাতে করে সে এর দ্বারা নিজে আল্লাহর দিকে জেনে বুঝে চলতে পারে, আর অপরকে দা‘ওয়াত দেবার ক্ষেত্রেও বুঝে-সুঝে দিতে পারে। বিশেষ করে যদি সে ইলমের অন্বেষণ বা জ্ঞান অর্জন হয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ মসজিদে; কারণ আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসে বর্ণিত, তিনি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছেনঃ
"مَنْ دَخَلَ مَسْجِدَنَا هذا يَتَعَلَّمُ خَيْراً أَوْ يُعَلِّمُهُ كان كَالْمُجَاهِدِ في سَبِيْلِ اللهِ، وَمَنْ دَخَلَهُ لِغَيْرِ ذلك كان كالنَّاظِرِ إِلَى ما لَيْسَ لَهُ".
“যে ব্যক্তি আমার মসজিদে শুধু এ জন্যেই আসে যে, সে কোন কল্যাণের দীক্ষা নেবে কিংবা অন্যদের শিক্ষা দেবে, সে আল্লাহর পথে জিহাদকারীর সমতুল্য। আর যে ব্যক্তি এর বাইরে অন্য কোন উদ্দেশ্য নিয়ে প্রবেশ করবে তাহলে সে যেন ঐ ব্যক্তির ন্যায় যে অপরের জিনিসের দিকে তাকিয়ে থাকে”। হাদীসটি ইমাম আহমাদ ও ইবনে মাজাহ সহ অনেকেই বর্ণনা করেছেন, এ হাদীসের সমর্থনে ইমাম ত্বাবরাণী তার হাদীস গ্রন্থে সাহাবী সাহাল ইবনে সা‘দ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন।


aburazin
aburazin
Latest page update: made by aburazin , Dec 12 2007, 11:18 PM EST (about this update About This Update aburazin Edited by aburazin


view changes

- complete history)
More Info: links to this page
There are no threads for this page.  Be the first to start a new thread.

Related Content

  (what's this?Related ContentThanks to keyword tags, links to related pages and threads are added to the bottom of your pages. Up to 15 links are shown, determined by matching tags and by how recently the content was updated; keeping the most current at the top. Share your feedback on Wetpaint Central.)